
বই পড়া, পড়া বই: ‘দৃষ্টি প্রদীপ’ ও ‘দুই বাড়ি’
২০২৬ সালে এসে বই পড়া বিষয়টা কেমন যেন ‘হয়ে ওঠে না’ টাইপ জিনিস হয়ে গিয়েছে। ইদানিং স্বল্প দৈর্ঘ্যের রিলস, শর্টস ইত্যাদির আধিক্যে ডোপামিন লুপে পরে মনোযোগের পরিধি যেন বৃত্ত থেকে বিন্দুতে এসে ঠেকছে। কোথাও দেখেছিলাম, বাবা-মা বই পড়লে নাকি শিশুরাও বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়। নিজেদের দুই বছরের কন্যাকে ‘ছোট আকারের বহুমাধ্যম যন্ত্র’ থেকে দূরে রাখতেই হোক, অথবা কিছুদিন আগে হাতে পাওয়া বিভূতিভূষণ উপন্যাস সমগ্রের মাঝে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেওয়ার জন্যই হোক, উত্তমার্ধ (better half!) আর আমি দুজনে শরতের এক শুক্রবার বসে পরলাম দুটো খণ্ড নিয়ে। বিভূতির আরণ্যক, আদর্শ হিন্দু হোটেল, পথের পাঁচালির নাম ডাক সবাই জানেন। পড়াও আছে এগুলো। দৃষ্টি প্রদীপ নামটা দেখে নিজে পড়া শুরু করলাম। আর ‘তিনি’ পড়লেন বিপিনের সংসার!
দৃষ্টি প্রদীপ
দৃষ্টি প্রদীপ মূলত জিতু বা জিতেন নামে মূল চরিত্রকে ঘিরে চলমান একটি কথাকাব্য। জিতেনের মাঝে এক অদ্ভুত ভবঘুরে স্বভাব লক্ষ্য করা যাবে। উপন্যাসটির শুরু হয় জিতুর আত্মীয় সম্পর্কে জ্যাঠার বাড়ি থেকে। সেখানেই তাদের আশ্রয়। এলাকার নাম আটঘরা, পশ্চিম বঙ্গ। এক অদ্ভুত হীনমন্য, অবহেলা আর অনাদরের জীবন এখানে তাদের। জিতু, তার মা, ভাই ও একমাত্র বোন। এ অবস্থা তাদের ছিল না। তাদের সুন্দর জীবন ছিল দার্জিলিং-এ। টি-এস্টেটে জিতুর বাবার চাকরির সুবাদে। দার্জিলিং-এর পার্টগুলোতে প্রকৃতির যে সৌন্দর্যের বর্ণনা পাওয়া যায়, তার সাথে আরণ্যক উপন্যাসের সাদৃশ্য পাওয়া যাবে। যারা আরণ্যক পড়েছেন, তারা একটা অদ্ভুত নস্টালজিয়া অনুভব করবেন। যারা পড়েননি, প্রকৃতিপ্রেমি হলে আরণ্যক পড়ার আগ্রহ তৈরি হবে। দার্জিলিং এর চরিত্রগুলোর মাঝে মিস নর্টনকে দেখতে ইচ্ছে হবে। জিতুর বাবার চাকরি চলে যাওয়ায় তাদের এ সুন্দর প্রকৃতি আর চমৎকার মানুষগুলোকে ছেড়ে আসতে হয় এই নরকে, জ্যাঠাইমাদের বাড়িতে। আটঘরার জীবন এক অসহ্য জীবন। পড়লে খুব কষ্ট হবে। রাগ হবে, ও বাড়ির মানুষগুলোকে অমানুষ মনে হবে। আর মনে হবে এ থেকে জিতু, তার ভাই নিতাই, বোন সীতা আর তার সর্বংসহা মা কি মুক্তি পাবে? মুক্তি কি পেয়েছিল?
এক পর্যায়ে জিতুকে আসতে হয় শ্রীরামপুরে। সেখানে নতুন অভিজ্ঞতা, বৌঠাকরুন, হালকা প্রেম ও নবজীবন পায় সে। কিছুদিন কলকাতায় এক জায়গায় চাকরি করে সে। কিন্তু চাকরি তার স্থায়ী হয় না। এর কারণ, তার রোগ। প্রশ্ন আসবে বার বার পাঠকের মনে, আসলেই কি কোন রোগ? নাকি তার বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা বা অদ্ভুত দৃষ্টিবিভ্রম? হ্যালুসিনেশন? যা নিয়ে সে নিজে অত্যন্ত আতঙ্কিত ছিল। একপর্যায়ে তার মনে হয়েছিল যে সে হয়তো মৃগীরোগে আক্রান্ত হয়েছে কিংবা তার বাবার মতো পাগল হয়ে যাচ্ছে। আসলেই কী হয়েছিল তার?
উপন্যাসের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে জিতুর সন্ন্যাস জীবন। শোনা যায়, বিভূতিভূষণের প্রথম স্ত্রীর অকালমৃত্যুর পর গভীর শোকে ও বৈরাগ্যে তিনি কিছুদিন প্রায় সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেছিলেন। যাপিত সে সন্ন্যাস-জীবনের জ্বলজ্যান্ত স্বাদ পাওয়া যায় এ অংশে। উপন্যাসে দ্বারবাসিনী গ্রামে আখড়ায় জিতুর বসবাস, বৈষ্ণবী মালতীর সাথে ঘনিষ্ঠতা, বটেশ্বরনাথ পাহাড়ে এক সাধুর সান্নিধ্য, পুরোটাই যেন একটা ঘোরলাগা সময়। লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা যেন কলমের কালিতে বেরিয়েছে নিজের মতো করে। মালতীর সাথে জিতুর সম্পর্কটা পূর্ণতা পেতে গিয়েও যেন পায় না। এক অদ্ভুত কষ্টের অনুভূতির নাম মালতী। আর তার মৃত্যু! যার খবর জিতু পায় চার বছর পর!
উপন্যাসের কাঠামোতে জিতুকে ভাইয়ের অসুস্থতা ও মৃত্যুতে তার পরিবারের হাল ধরতে হয়। ঘটনাচক্রে সে চলে আসে কামালপুর নামক স্থানে, পাঠশালা খুলে মাস্টার মশাই বনে যায়। সেখানে ষোড়শী হিরন্ময়ীর সাথে প্রণয়।
মোট তিনজনের সাথে মুখ্য চরিত্র জিতুর রোমান্স দেখা যাবে এ উপন্যাসে। কিন্তু সে কাকে চেয়েছিল মূলত জীবনে? পায়ই বা কাকে? এ উপন্যাসে প্রেমের থেকেও বৃহৎ একটি বিষয় উঠে আসে পরতে পরতে। সেটা হলো সৃষ্টিকর্তা। শুরুর জীবনে যিশু খ্রিস্টের প্রতি আগ্রহী হয় সে। পরবর্তীতে তার মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা আরও বিশাল, বৃহৎ এক সত্ত্বা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এরকম চ্যালেঞ্জ যে বিভূতি করতে পেরেছেন লেখায়, তা অবাক করেছে। আর ভালো লেগেছে তার ঐ অলৌকিক দৃষ্টি ক্ষমতা। যা দিয়ে সে সৃষ্টি দেখতো, সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ দেখতো, আরও অনেক কিছুই দেখতে পেত। একবিংশ শতাব্দীর সাইকাডেলিক ড্রাগস নিয়ে মানুষ যেসব জিনিস দেখতে পায় বলে দাবি করা হয়, আর বর্তমান যুগের এনিমেশন-গ্রাফিক্স ব্যবহার করে যেসব অতিমানবীয় দৃশ্য আমরা প্রাইম ভিডিও আর নেটফ্লিক্সে দেখি, সেসবের দারুণ লিখিত বর্ণনা বিভূতিভূষণ দিয়েছেন আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগেই! এই দৃষ্টির প্রদীপ কি জিতুর জীবনে কোন ঐশ্বরিক উপহার নাকি ট্র্যাজেডি? বার বার প্রশ্ন জাগবে পড়তে গিয়ে!
এখন একটু সমালোচনা করি। পড়তে গিয়ে গিন্নির সাথে যেকবার কথা হয়েছে, তার পঠিত ‘বিপিনের সংসার’ এর প্রটাগনিস্ট বিপিনের সাথে জিতুর মিল পেয়েছি অনেক। ভালাভোলা মানুষ, কারও ক্ষতি চায় না, সব সহ্য করে নেয়, প্রেম প্রকাশ করতে পারে না। খুব বেশি চাহিদা নেই, অন্যের অনিষ্ট করতে পারে না, অনেস্ট, এরকম আর কি। পরের যে বইটি নিয়ে কথা বলব, ‘দুই বাড়ি’, সেই নিধুর সাথেও যেন অনেক মিল! গুডরিডসে গেলে অনেকেই রিভিউ-এ বলবেন, বিভূতিভূষণ পথের পাঁচালির অপুর চরিত্র থেকে কোনদিন বের হতে পারেননি। আমি অতো সাহিত্য বোদ্ধা নই, তবে কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোতে আরেকটু ভেরিয়েশন দরকার ছিল মনে হয়। বিভূতির প্রতিটি পুরুষ চরিত্রকে নারীগণ পরম যত্নে লুচি, আলুর দম, চপ, চা, পান এসব খাওয়াবেই বা কেন? এতো কেন খাতির দরদ? এ কি বিভূতির নিজের কোন অপূর্ণ চাওয়াকে লেখনি দিয়ে পূর্ণ করার প্রচেষ্টা?
দৃষ্টি প্রদীপ উপন্যাসের মৃত্যুগুলো আপনাকে খুব ভাবাবে। জিতুর বাবার মৃত্যু, মায়ের মৃত্যু, ভাইয়ের মৃত্যু, ভাতিজি পানীর মৃত্যু, আটঘরা গ্রামের হতদরিদ্র ভিখারি হীরু রায়ের মৃত্যু কিংবা মালতীর মৃত্যু! সবগুলো হারানোকে জিতু কীভাবে গ্রহণ করছে, কীভাবে ভাবছে, তার জীবনের বিবর্তন, দুঃখ-কষ্ট এবং ভেতরের বৈরাগ্য ও জীবনবোধ গড়ে ওঠার পেছনে উপন্যাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এ চরিত্রগুলোর মৃত্যু গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।
পড়া শেষে মনে হবে, এ কি প্রেম কাহিনী নাকি আধ্যাত্মিক দর্শন? জিতু বা জিতেন সকলের প্রিয় পাত্র যেন হতে হতেও হয়ে উঠতে পারে না। তার কি আরেকটু সাহসী, আরেকটু প্রতিবাদী এবং এক্সট্রোভার্ট হওয়া উচিত ছিল না? সুখপাঠ্য বই। রিকমেন্ডেড।
দুই বাড়ি
এবার দুই বাড়ি নিয়ে কথা বলা যাক। দুই বাড়ি নিধু নামে সদ্য মোক্তারি পরীক্ষা ফেরত বয়স পঁচিশের এক তরুণ ও তার অপূর্ণ প্রেমের গল্প। উপন্যাসটি আকারে ছোট। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ধরে রাখে পুরোটা সময়। কী এক অসম চাওয়া, অপ্রাপ্তি, আকুতি!
অভাবের সংসারে হাল ধরে নিধু। মহকুমা শহর রামনগরের আদালতে গিয়ে মোক্তারি অর্থাৎ ওকালতি শুরু করে নিধু। দুই টাকা চার টাকা আয় রোজগার হলেই শনিবার ছয় ক্রোশ হেটে বাড়ি ফেরে (পাদটীকা: এক ক্রোশ বা কোশ সাধারণত প্রায় ২ মাইল বা ৩.২ কিলোমিটারের মতো)। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়। রামনগর আদালতের কাজ শেষে সপ্তাহান্তে নিধু শুধুমাত্র টাকা বাঁচানোর জন্য এই পথটুকু হেঁটেই যাতায়াত করত। পথিমধ্যে বিভূতিসুলভ প্রকৃতির বর্ণনা ফ্রি।
এরকমই এক উইকেন্ডে এসে বাড়ির পাশের চিরকাল নীরব প্রাসাদসম একটি বাড়িতে বহু আলো দেখতে পায় নিধু। এ আলো যে তার জীবনেও আলো হয়ে আসবে, তা কে জানতো? ঘটনাক্রমে এ বাড়ির কর্তা জজসাহেব লালবিহারীবাবুর ষোল বছর বয়সী কুমারী মেয়ে চপলা মঞ্জুর সাথে নিধুর আলাপ হয়। মঞ্জুরী দেবী। এরকম শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা, উদার চিন্তার মেয়ে নিধু জীবনেও দেখেনি! বিধাতার এক অসম্ভব সৃষ্টি মনে হয়। লেখার ভাষায়, “নিধু শিক্ষিতা মেয়ের সঙ্গে কখনো মেশে নাই। এসব পাড়াগাঁয়ে মেয়েরা হাইস্কুলে পড়া দূরের কথা অনেকে বাংলা লেখাপড়াই ভালো জানে না। নিধুর মনে হইল সে এমন একটি জিনিস দেখিতেছে, যাহা সে কখনো পূর্বে দেখে নাই। তাহার মনে চিরকাল সাধ ছিল ভালো লেখাপড়া শিখিবে-কিন্তু দারিদ্র্য বশত সে সাধ পূর্ণ হইল না। তবুও লেখাপড়ার কথা বলিতে সে ভালোবাসে। এ পাড়াগাঁয়ে লেখাপড়াজানা লোক নাই, কলা কুমড়া চাষের কথা শুনিতে বা বলিতে তাহার ভালো লাগে না, অথচ এখানকার গ্রাম্য মজলিসে ওসব কথা ছাড়া অন্য বিষয়ের আলোচনা করিবার লোক নাই।”
উপন্যাসের এক প্রান্তে রয়েছে মঞ্জুরীদের ধনী, অভিজাত ও বৈভবশালী বাড়ি। অন্য প্রান্তে রয়েছে নিধুদের দরিদ্র, জীর্ণ ও সাধারণ গ্রামের বাড়ি। এই দুটি বাড়ি আসলে সমাজের দুটি ভিন্ন মেরুর প্রতিনিধিত্ব করে যেন। দুই বাড়ি নামকরণের সার্থকতা এখানেই।
সে সময়ে আদালত পাড়ার কৃষ্টি কালচার কি সুনিপুণভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন! সবজজ, হাকিম, সাবডেপুটি, মুন্সেফ, মোক্তার, পেশকার, মুহুরিসহ চরিত্রগুলোর চিত্রায়ন বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না। বিভূতি যেন কোর্ট কাছারিতে পরে থাকা লোক। কার কি চাহিদা, কার মনের কী খোঁজ – সব জানেন! মহকুমার সাবডেপুটির সাথে নিধুর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। সাবডেপুটি পদটি হলো সাবডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বা সাবডেপুটি কালেক্টর। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা ছিলেন তারা। মহকুমা পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের তদারকি এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারিক কাজ করতেন। বর্তমানে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের মাঠ পর্যায়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অথবা ইউএনও-এর মতো পদগুলোকে তৎকালীন সাবডেপুটি পদের আধুনিক রূপ বলা যেতে পারে (নিজের বর্তমান কর্মরত পদের সাথে মিলে যাওয়ায়, সাবডেপুটি সুনীল বাবুর মাঝে নিজেকে একটু দেখতে পাচ্ছিলাম মনে হচ্ছিল!)।
নিধু বিভূতির সেই সহজ, সরল, লোক-না-ঠকানো, অনেস্ট চরিত্র। মনে হবে অপু, বিপিন, জিতু আর নিধু যেন একই বাড়ির একগাঁদা সমমনা সন্তান! বিভূতিভূষণের ঔরসে জন্মানো জমজ ভাই সব। মোক্তারি করতে এসেছে, অথচ মক্কেল ধরবার চালাকি জানে না। সিনিয়রেরা এ নিয়ে হাসাহাসি করে মাঝে মাঝে। সাবডেপুটির সাথে তার সখ্যতা অনেকের হিংসার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। রামনগরের শনিবার মানেই বিকেল বেলা নিধু বাড়ির পথে হাঁটা দিবে এখুনি। তার গ্রামের বাড়ির ওই প্রাসাদটিতে ছুটিতে বেড়াতে আসা মঞ্জু যেন তার জন্য অপেক্ষা করছে! মঞ্জু চলে যায়নি তো? যে তাকে গান শুনিয়েছে, মুকাভিনয় করে দেখিয়েছে। রান্না করে খাইয়েছে, কবিতার আবৃতি করে শুনিয়েছে পুরো দুটি। রবী ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ আর মাইকেল মধুসূদনের ‘রসাল ও স্বর্ণলতিকা’। প্রতি সপ্তাহে তার বাড়ি ফেরা, আদালত চত্বরে নানান সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা, আর্থিক অনটন, কাছারির নানান ঘটনা, আবার বাড়ি ফিরে অন্য এক নিধু, পুরো লেখা কেমন চুম্বকের মতো ধরে রাখে!
মঞ্জু আর নিধুর সম্পর্কটা অসমাপ্ত থেকে যায়। তবে মঞ্জু নিধুর প্রতি যে দয়া মায়া দেখিয়েছে, তা পাওয়া আসলেই দুষ্কর। লেখকের কথাগুলো শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না, “নিধু বুদ্ধিমান লোক, সে কথাটা ভালো করিয়া ভাবিল। মঞ্জুর প্রতি তাহার মনোভাব এমন হওয়ার হেতু কি? মঞ্জু সুন্দরী মেয়ে, কিন্তু সুন্দরী সে একেবারে দেখে নাই তাহা তো নয়, সেজন্যে সে আকৃষ্ট হয় নাই। তাহাকে আকৃষ্ট করিয়াছে-তাহার প্রতি মঞ্জুর সদয় ও মধুর ব্যবহার, মঞ্জুর আদর, সৌজন্য-অত বড়লোকের মেয়ে সে, শিক্ষিতা ও রূপসী, তাহার উপর এত দরদ কেন তার?
এ এমন একটা জিনিস-নিধুর জীবনে যাহা আর কখনো ঘটে নাই, একেবারে প্রথম। তাই মঞ্জুর কথা ভাবিলেই, তাহার মুখ মনে করিলেই নিধুর মন মাতিয়া ওঠে-তাহাকে উদাস ও অন্যমনস্ক করিয়া তোলে-সব কিছু তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর মনে হয়।
অথচ ইহার পরিণাম কি? শুধু কষ্ট ছাড়া?”
দৃষ্টি প্রদীপে যেমন বড়লোক জ্যাঠাইমা রূঢ় আচরণ করতেন, এখানে বড়লোক চরিত্রগুলো বেশ ভালো, আন্তরিক। যেমন, মঞ্জুর মা সহ পরিবারের সবাই প্রায়। নিধুর মা কিন্তু নিজের মা নন। সৎ মা। তবুও তার চরিত্রটা অসাধারণ। নিধুর বাবা রামতারণকে দিয়ে যেভাবে উপন্যাস শুরু হয়েছিল, তাকে পরে তেমন একটা দেখা যায়নি, তেমন মুখ্য ভূমিকাও ছিল না তার। গল্পের প্রয়োজনে যদু মোক্তার, সাধন মোক্তার, মঞ্জুর ভাই বীরেন এসব প্রয়োজনমতো এসেছে। অত্যন্ত গোছানো লেখা। পাঠক ধরে রাখার কৌশল অসামান্য এখানে। কোন অতিরিক্ত প্রকৃতি বর্ণনা নেই।
গল্পটা হুট করে শেষ হয়ে যায়। কীভাবে শেষ হয়, তা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। খুবই রাগ হয়। এভাবে শেষ না করলেও তো হতো। আর মঞ্জু? কোথায় সে? পুজোর সময় তারা সকলে মিলে যে একটা ‘প্লে’ করবে বলেছিল। নিধুর যে পার্ট নিবার কথা ছিল। তা কি হয়েছিল শেষমেশ? নিধু কি বড়লোক হতে পেরেছিল? অদ্ভুত সুখপাঠ্য বই। হাইলি রিকমেন্ডেড।
দুই বাড়ির নিধু আর দৃষ্টি প্রদীপের জিতুর অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং টানাপোড়েন অনেকটা একই হলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহে ভীষণ উপভোগ্য দুটি উপন্যাস পড়ে পাঠকের মনে মানবজীবনের অস্ফুট চাপা কষ্ট ও অপ্রাপ্তি যেন একটু নাড়া দিয়ে যায়।