
হেমন্তের আকাশ
২০১৬ বা ১৭ সালের দিকে হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও নামে একটা প্রজেক্ট শুরু করি কয়েকজন মিলে। সেটার জন্য একটা ডোমেইনও নেওয়া হয়। সেখানে মানুষের গল্প বলা হতো। সেটার একটা পেইজও আছে। যার অর্গানিক ভিউ বেশ ভালো। সেটার একটা ব্লগও ছিল। পাব্লিক ব্লগ। সবাই লিখতে পারে এমন। সেখানে অনেকগুলো লেখা লিখেছিলাম। আনফরচুনেটলি সেখানকার বেশ কয়েকটা লেখার কপি অন্য কোথাও বা আমার এ ব্লগে তুলে রাখিনি। এর মাঝে ২০২৩-এ হুট করে ডোমেইনটা রিনিউ না করায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ডেটাবেজটাও কীভাবে যেন হোস্টিং থেকে হারিয়ে ফেলি! একদম যা তা অবস্থা। আজকে হুট করে আর্কাইভ ডট ভিএন আর ওয়েব্যাক মেশিনের কথা মাথায় আসল। দেখলাম, ওয়েব্যাক মেশিন চমৎকার করে আর্কাইভ করে রেখেছে সব! সেখানে মার্চ ০৩, ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত ব্লগটি আর্কাইভ হিসেবে এখানে তুলে রাখলাম।
মুভি রিভিউ কীভাবে লিখতে হয় আমি জানিনা, শুধু আমার অনুভূতিটা তুলে দিচ্ছি।
ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে মুভি দেখে সময় কাটাচ্ছি। টানা তিনদিনের হরতালে বেশ জমিয়ে মুভিগুলো দেখছি। ক’দিন আগে আমার বন্ধু বাপ্পির কাছে কিছু মুভি নিলাম। প্রায় দশটার মত। এর মধ্যে একটা ছিল October Sky. সেদিন সজল ভাইয়াকে বললাম মুভিটার কথা, ভাইয়া বললেন, “নামাইতেসি…”। দশ মিনিটের মাথায় মুভি নামানো শেষ। ভাইয়া দেখতে শুরু করলেন ঐ রাতেই। মুভি দেখে ভাইয়া এটার নাম দিলেন “হেমন্তের আকাশ”। কি সুন্দর কি সুন্দর!
সকালে উঠে ক্ষুদে বার্তা পেলাম ভাইয়ার কাছ থেকে-
“দেখলাম । ভালো লেগেছে । মুভিটা ১৯৫৭ এর অক্টোবরের স্পুটনিক-১ এর ঘটনায় উৎসাহিত হয়ে বিজ্ঞান মনোভাব প্রবল ৪ জন যুবকের কাহিনী । ভালো লাগবে তোমার ।”
আজ সকালে উঠে মনে হল চমৎকার মুডে মুভিটা দেখে ফেলি। যেই ভাবা সেই কাজ। দেখা শুরু করলাম। মুভিটা দেখা শেষ করলাম, এটা নিয়ে লেখার লোভ সামলাতে পারছি না।
ভাইয়াই বলেছেন, ১৯৫৭ এর অক্টোবরের স্পুটনিক-১ এর উৎক্ষেপণ এর ঘটনাকে ঘিরে নির্মিত এই মুভিটি। আইএমডিবি রেটিং-এ এটি ৭.৭ পেয়েছে। পরিচালক তার নৈপুণ্যের সবটুকুই ঢেলে দিয়ে পরিচালনা করেছেন নিঃসন্দেহ। এটি নাসার ইঞ্জিনিয়ার ‘হোমার হিকাম’ সাহেবের আত্মজীবনী ‘Rocket Boys’-এর অবলম্বনে নির্মিত। মুভিটি ১৯৯৯ সালে নির্মাণ করা হয়।
প্রতিটি চরিত্রই যে এতো চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। Jake Gyllenhaal এখানে ‘হোমার হিকাম’ নামের এক কিশোরের রকেট বানানোর স্বপ্নে বিভোর একটি চরিত্রকে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। বিভিন্ন দৃশ্যে হোমারের কথোপকথন তার দৃঢ় সংকল্পকে স্পষ্ট করে তোলে। বাবার সহকর্মী বাইকভস্কির কাছে সে যখন ওয়েল্ডিং শিখতে চাইল, উনি বললেন, “you don’t give up… do you?” হোমার জবাব দিল, “I can’t”.
মিস র্যালি ছিলেন হোমারের শিক্ষিকা। তাঁর মত একজন শিক্ষিকার খুব প্রয়োজন অনুভব করি প্রতিটি স্কুলে স্কুলে। রকেট বানানোর কাজগুলোতে উৎসাহ দিলে মিস র্যালিকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক জন টার্নার এটাকে ‘false hope’ বলেন। এবং বেশ ভালমত এটাকে প্রত্যাখ্যান করেন মিস র্যালি। প্রধান শিক্ষকের কথাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করবার মাধ্যমে মিস র্যালি তাঁর শিক্ষার্থীদের উপর তীব্র আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। চার যুবকের একজন কোয়েন্টেনের জরাজীর্ণ বাসা হোমার দেখে ফেললে, লজ্জায় কোয়েন্টেন তাকে অনুরোধ করে কাউকে না জানানোর জন্য। হোমার তাকে বলে, “Quentin, I wouldn’t care if you lived in the Governor’s mansion…”। এই কথাটাই বুঝিয়ে দেয় এই কিশোর যুবকের চিন্তাধারার গভীরতা!
বাবার প্রচ্ছন্ন ভালোবাসার চমৎকার এক চমৎকার উদাহরণ জন হিকাম (হোমারের বাবা)। হোমারের রকেট সংক্রান্ত কাজে কখনও উৎসাহ দেওয়া তো দূরের কথা তিনি কখনও দেখতে চাইতেন না তাঁর সন্তান কি করতে চাইছে। শেষ দৃশ্যে হোমারের কাঁধে হাত রেখে তিনি মুভি জুড়ে সমস্ত সময়টার দর্শকের অব্যক্ত ক্রোধের অবসান ঘটান। বাবারা তো এমনই হন। মুখে কি বাবাদের বলতে হয়, বাবারে তোমার সকল কাজে আমার নীরবতাই যে আমার নিশ্চুপ সমর্থন?
এই মুভিটিকে দেখার মত একটি ইন্সপিরেশনাল মুভি বলা যেতে পারে। বারবার হেরে গিয়েও জেতার আকাঙ্খা যে কি জিনিস তা এই মুভি কানে কানে বলে দিবে। মুভিটির আবহ সঙ্গীত অতি চমৎকার, মার্ক ইশাম সাহেবের করা শ্রুতিমধুর ধ্বনিগুলো অজানা আশা জাগায় দর্শকের মনে।

আমার সেজো মামা বলতেন, “স্বপ্ন দেখা আর লালন করা ভিন্ন জিনিস”। এই মুভিতে আমি হোমারকে স্বপ্ন দেখতে দেখিনি, স্বপ্ন লালন করতে দেখেছি! আশা করি, এই মুভি বিজ্ঞানমনস্ক তরুণদের তাদের স্বপ্ন লালন করতে সাহায্য করবে। যারা দেখেননি দেখতে পারেন।
উৎসর্গঃ বন্ধু আরেফিন আর বিজ্ঞানীবন্ধু বাপ্পিকে। ধারা দুদিকে হলেও হোমার হিকাম-এর সাথে দুজনের সাদৃশ্য পেয়েছি কোথাও।