
এলোমেলো শৈশব – ২
২০১৬ বা ১৭ সালের দিকে হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও নামে একটা প্রজেক্ট শুরু করি কয়েকজন মিলে। সেটার জন্য একটা ডোমেইনও নেওয়া হয়। সেখানে মানুষের গল্প বলা হতো। সেটার একটা পেইজও আছে। যার অর্গানিক ভিউ বেশ ভালো। সেটার একটা ব্লগও ছিল। পাব্লিক ব্লগ। সবাই লিখতে পারে এমন। সেখানে অনেকগুলো লেখা লিখেছিলাম। আনফরচুনেটলি সেখানকার বেশ কয়েকটা লেখার কপি অন্য কোথাও বা আমার এ ব্লগে তুলে রাখিনি। এর মাঝে ২০২৩-এ হুট করে ডোমেইনটা রিনিউ না করায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ডেটাবেজটাও কীভাবে যেন হোস্টিং থেকে হারিয়ে ফেলি! একদম যা তা অবস্থা। আজকে হুট করে আর্কাইভ ডট ভিএন আর ওয়েব্যাক মেশিনের কথা মাথায় আসল। দেখলাম, ওয়েব্যাক মেশিন চমৎকার করে আর্কাইভ করে রেখেছে সব! সেখানে নভেম্বর ০২, ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত ব্লগটি আর্কাইভ হিসেবে এখানে তুলে রাখলাম।
শিরোনামটা “এলোমেলো শৈশব” দিবার একমাত্র কারণ, ঘটনাগুলোর সময়রেখা কোন নির্ধারিত ছকে বাঁধা নয়। ছোটবেলার যখন যে বিষয়টা মাথায় আসছে, সেটাই লিখে ফেলছি। ব্লগে লিখে রাখছি খুব বড় কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। একান্তই নিজের জন্য! অনেক বয়স যখন হয়ে যাবে, বুড়িয়ে যাব যখন, তখন যদি নিজে পড়তে নাও পারি, নাতি-নাতনিদের অনুরোধ করব পড়ে শোনাবার জন্য। আর পাবলিকলি রাখা হচ্ছে এজন্য যে, কাছের মানুষগুলোর মন্তব্য-ভৎর্সনা থেকে সবাই ধারণা পাবেন, আমার আশেপাশে কত রসিক বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন।
এই সিরিজ শুরু করা হয় এ বছর ২০১৭ সালে। এটার একটা আগের পর্ব আছে। আগ্রহী পাঠক চাইলে পড়তে পারেন।
আমরা যে কিন্ডার গার্টেনে লেখাপড়া করেছি তার নাম সানফ্লাওয়ার কিন্ডার গার্টেন। বস্তুত সূর্য ওঠার আগেই আমরা (ভাইয়া আর আমি) স্কুলে ব্যাগ রেখে আসতাম। যদিও আমাদের বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব মাত্র দুই তিন মিনিটের! এই স্কুলে পড়ার সময় একাডেমিক কালচারের সাথে সাথে কোকারিকুলার আর এক্সট্রাকারিকুলার যা যা করা হয়েছে তা এখনও অনেক শহুরে আধুনিক স্কুলে দেখতে পাই না! এরকম মফস্বলের একটা অখ্যাত স্কুলে আমরা বছর ঘুরে ২১ ফেব্রুয়ারি অথবা অন্যান্য বিশেষ দিবসগুলো উপলক্ষে একটা করে নাটিকা মঞ্চায়ন করতাম। খুব মনে পড়ে, আমরা ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ইব্রাহিম স্যারের বাসায় ঘুর ঘুর করতাম। স্যার হয়তো একটা নাটক ঠিক করতেন। ১৫-১৬ তারিখের দিকে আমাদের সত্যিকারের রিহার্সেল শুরু হত। স্যারের বাসার আঙিনায়, সরকারি হাসপাতালের পেছনে। সেগুলো নিয়ে কিছু বলি আজ।
ভাষা আন্দোলন:
আমি তখন ক্লাস টু-এ। দ্বিতীয় শ্রেণি। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে স্কুল প্রাঙ্গনে নাটিকার আয়োজন করা হল। ইব্রাহিম স্যার আমাদের তৎকালীন ক্লাস থ্রি-ফোরের ভাইয়াদের রিহার্সেল করালেন। নাটিকার বিষয়বস্তু, একুশে’র ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে। মনে আছে. রাফি ভাইয়া, সাইমুম ভাইয়া, বন্ধন ভাইয়া, মোস্তাফিজ ভাইয়াদের ভাষা আন্দোলনের অভিনয়। বড়জোর ছয়-সাত মিনিটের নাটিকা। একদল সংগ্রামি ছাত্র মিটিং করছে, কিছুতেই তারা রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উর্দুকে মেনে নিবে না। তারা আন্দোলনে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ২১ ফেব্রুয়ারি রাজপথে নেমে আসে তাঁরা। যথারীতি শহীদ মিনারের সামনে পুলিশ তাদের উপর গুলি চালায়। এটুকুই। নাটিকায় দেখার মত ছিল গুলি খেয়ে ভাষা আন্দোলনকারীদের পরে থাকবার দৃশ্য! পেটে পলিথিনে করে লাল রঙের পানি রেখেছিল ভাইয়ারা। গুলি খাওয়ার মুহুর্তে পলিথিনটা শুধুমাত্র ফুটো করে দিলেই রক্তমাখা লাশগুলোর দারুণ একটা দৃশ্যায়ন ঘটে।
আমার অগ্রজ সেঁজেছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (মাথায় জিন্নাহ টুপি)। তার কন্ঠে ছিল, “Urdu & Urdu shall be the state language of Pakistan…”।
প্রচন্ড ইচ্ছা থাকার পরেও বয়সটা কম হবার কারণে আমাকে এ নাটিকায় অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি। খুব মন খারাপ হয়েছিল সেদিন। উত্তেজনা আর দুঃখ দুটো পৌন-বিপরীত অনুভূতি নিয়ে আমাকে নাটিকা উপভোগ করতে হয়েছিল। আর সে কস্টটা ঘুচতে সময় লেগেছিল পুরো এক বছর!
মুক্তিযুদ্ধ:
পরের বার আমরা ইব্রাহিম স্যারের তত্ত্বাবধানে মঞ্চস্থ করলাম স্বাধীনতা সংগ্রাম এর প্রাক্কালীন বিষয়কে ঘিরে একটি নাটিকা। রাফি ভাইয়ার চরিত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শেখ মুজিবুর রহমান! ভাইয়া খাঁজা নাজিমুদ্দিন। আমাকে দেওয়া হল টাঙ্গাইলের শফিউর রহমানের চরিত্র। আমার বক্তব্যের এক পর্যায়ে কথাগুলো ছিল এরকম, “We have to make a DEMOCRATIC country…”। তখনো আমি জানিনা ডেমোক্রেটিক শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘গনতান্ত্রিক’। পরে অবশ্য আব্বুর কাছে জেনে নিয়েছিলাম। সাদা পাঞ্জাবি পড়ে মাথায় টুপি দিয়ে আঙ্গুল উচিয়ে অভিনয় করার সময় যেন নিজেই শফিউর রহমান বনে যাচ্ছিলাম। ক্লাস থ্রি পড়ুয়া একজন ছাত্রের কাছে এর থেকে বেশি আর কী-ই বা হতে পারে বলুন?
সিরাজউদ্দৌলা:
পরের বছর মঞ্চস্থ হল ‘সিরাজউদ্দৌলা’। সিকান্দার আবু জাফরের সিরাজউদ্দৌলা নাটকের বিশেষ কিছু মুহুর্ত এক করে ইব্রাহিম স্যার পরিসরটা ছোট করে আনেন। এ নাটকে সিরাজউদ্দৌলা চরিত্রটা করবার মহান সুযোগ পেল মোস্তাফিজ ভাইয়া। মিস্টি আপু পেল ঘষেটি বেগমের চরিত্র। ভাইয়া মদনলাল। আমি যথারীতি ঊর্মিচাঁদ। বিশাল চাটুকার। ঊর্মিচাঁদের চরিত্রে একটা জায়গায় মিথ্যা কান্নার অভিনয় করতে হয়। মানে অভিনয়ের ভেতরে অভিনয়! এ জটিল বিষয়টা কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না (না পারারই কথা)। তো রিহার্সেলের সময়টায় একদিন কান্নার অবতারণার জন্য স্যার আমাকে সত্যি সত্যি আসতে করে চপেটাঘাত করলেন। কেঁদেও দিলাম তৎক্ষণাৎ। তবে তা রিহার্সেলে কাজে দিল!
নিজের শৈশবটা বর্ণিল ছিল ভাবতেই আনন্দ লাগছে। যদিও আমরা কেউ তখন অভিনয়ে পটু ছিলাম না। এবং পরবর্তী জীবনে এদের কেউই এ পেশার ধারের কাছেও ঘেঁষেনি, তবুও এও কম কি?
“আহারে জীবন , আহা জীবন
জলে ভাসা পদ্ম যেমন”