এলোমেলো শৈশব – ১

২০১৬ বা ১৭ সালের দিকে হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও নামে একটা প্রজেক্ট শুরু করি কয়েকজন মিলে। সেটার জন্য একটা ডোমেইনও নেওয়া হয়। সেখানে মানুষের গল্প বলা হতো। সেটার একটা পেইজও আছে। যার অর্গানিক ভিউ বেশ ভালো। সেটার একটা ব্লগও ছিল। পাব্লিক ব্লগ। সবাই লিখতে পারে এমন। সেখানে অনেকগুলো লেখা লিখেছিলাম। আনফরচুনেটলি সেখানকার বেশ কয়েকটা লেখার কপি অন্য কোথাও বা আমার এ ব্লগে তুলে রাখিনি। এর মাঝে ২০২৩-এ হুট করে ডোমেইনটা রিনিউ না করায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ডেটাবেজটাও কীভাবে যেন হোস্টিং থেকে হারিয়ে ফেলি! একদম যা তা অবস্থা। আজকে হুট করে আর্কাইভ ডট ভিএন আর ওয়েব্যাক মেশিনের কথা মাথায় আসল। দেখলাম, ওয়েব্যাক মেশিন চমৎকার করে আর্কাইভ করে রেখেছে সব! সেখানে জুন ২৪, ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত ব্লগটি আর্কাইভ হিসেবে এখানে তুলে রাখলাম।

শিরোনামটা “এলোমেলো শৈশব” দিবার একমাত্র কারণ, ঘটনাগুলোর সময়রেখা কোন নির্ধারিত ছকে বাঁধা নয়। ছোটবেলার যখন যে বিষয়টা মাথায় আসছে, সেটাই লিখে ফেলছি। ব্লগে লিখে রাখছি খুব বড় কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। একান্তই নিজের জন্য! অনেক বয়স যখন হয়ে যাবে, বুড়িয়ে যাব যখন, তখন যদি নিজে পড়তে নাও পারি, নাতি-নাতনিদের অনুরোধ করব পড়ে শোনাবার জন্য। আর পাবলিকলি রাখা হচ্ছে এজন্য যে, কাছের মানুষগুলোর মন্তব্য-ভৎর্সনা থেকে সবাই ধারণা পাবেন, আমার আশেপাশে কত রসিক বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন।  যাই হোক, শুরু করি।

আধবোতল সরিষা তেল: আইয়ুব দাদুর হোমিও ওষুধের দোকানটা ঠিক আমাদের বাসাটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। আব্বু আম্মু দুজনই হাইস্কুলে চলে যেতেন ঠিক আমরা কেজি স্কুল থেকে আসবার আগে-পরে অর্থাৎ বেলা ১০টার দিকে। দুই ভাই মিলে খেলাধুলা করতাম দাদুর দোকানের বারান্দায়। বলে রাখা ভালো সমবয়সী হবার কারণে খুবই মারামারি করতাম দুজনে। দাদুর ভাষ্যমতে ‘একজনের পা আরেকজনের মাথায়’ টাইপ অবস্থা! তো এরকম মারামারি করার পর আম্মু নাকি খুব মেরেছিল সেদিন! মার খেয়ে দুই ভাই মিলে নাকি এক বোতল সরিষার তেল ভাগ করে গিলে ফেলেছিলাম! ভাবা যায়! পুরা আধাবোতল সরিষা তেল! 

[এ লেখার যদি আরও সংখ্যা থাকে তাহলে দাদুর নাম অনেকবার আসবে।]

আমার হারিয়ে যাওয়া: এক বিকেলে বাসার সামনে খেলছিলাম বা হাঁটছিলাম। তখন নার্সারি কিংবা কেজিতে পড়ি। আমাদের বাড়িটা মফস্বলে। সেখান থেকে আমাদের গ্রামের বাড়ি ভবানিপুর মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। আব্বু মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছেন। আমি আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছো? আব্বু বলল, দাদুর বাড়ি। যাবে নাকি? সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লাম মোটরসাইকেলের সামনে। কাউকে না বলে চলে যাওয়া আমাদের বাসায় কাজে সাহায্য করার জন্য যে ছিলেন, তার নাম ছিল শিল্পি। অনেকক্ষণ পরে আমাকে বাসায় পাওয়া গেল না যখন তার ধারণা হল, আমি হারিয়ে গিয়েছি। আম্মু, ভাইয়া, শিল্পি, আইয়ুব দাদু সবাই মিলে খোঁজা শুরু করে দিল। মোবাইল ছিল না, আব্বুকে জানানো গেল না। সারা বাজার খোঁজা হল। আম্মু নিশ্চিত আমাকে ছেলেধরা নিয়ে গেছে। সবাই কান্নাকাটি অবস্থা!

সন্ধ্যার পর আব্বু আমি দাদুর বাড়ি থেকে ফিরলাম। আমাকে দেখে শিল্পি আপু কেঁদে দিল! বেচারা ধরেই নিয়েছিল, আমি নাই হয়ে গেছি। পরে অবশ্য আম্মুর হাতে একটু মার খেতে হল। আব্বুও যথেষ্ট বকা খেলেন না বলে নিয়ে যাবার জন্য!

ঝাড়ুদার মা: বাজারের চৌরাস্তার মোরে আমাদের একটা দোকান আছে। একসময় আমার ছোটচাচা এখানে ওষুধের দোকান করতেন। তারও আগে আমার দাদা বসতেন এখানে। তারও আগে আমাদের মফস্বলের বাসাটাই ছিল আমার দাদার ডিসপেনসারি! তো এক দুপুরে বাসা থেকে কেন যেন চাচ্চুর দোকানে যাচ্ছি। বের হবার সময় দেখলাম আম্মু ঘর ঝাড়ছে। স্বাভাবিক একটা বিষয়।

চাচ্চুর দোকানে গেলাম। বসে আছি। সিভিট খাচ্ছিলাম যতদূর মনে পড়ে। এক অপরিচিত ভদ্রলোক এলেন। ভাইস্তা সম্বোধন করে কথা বলতে লাগলেন। এক সময় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আব্বু কি করে? যদিও আমার ধারণা তিনি জানেন আমার আব্বু কি করেন। কিন্তু ছোটবেলায় এমন অনেকেরই হয়, পরিচিত জনেরাও জিজ্ঞেস করেন বাবা-মা কি করেন। এমনকি নিজের মামাও জিজ্ঞেস করেন, বলতো তোমার আব্বুর নাম কি? তোমার নানাজানের নাম কি?! তখন খুব মেজাজ খারাপ লাগতো। নিজের বাপের নাম জানে না!

তো যাই হোক,  সে ভদ্রলোককে বললাম, আব্বু শিক্ষক। যথারীতি জিজ্ঞেস করলেন, আম্মু কি করে? আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার আর মনেই পড়ছে না আম্মু কি করে!? তৎক্ষণাৎ মনে হল, বাসা থেকে বের হবার সময় আম্মুকে ঘর ঝাড়ু দিতে দেখেছি। চট করে বললাম, আমার আম্মু ঘর ঝাড়ু দেয়। এ কথা শোনার পর মানুষটার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল মনে নেই। কিন্তু বাসায় এসে আম্মুকে বলেছিলাম ঘটনাটা। এবং এটা ছিল আমার অনেক বড় ভুল! আম্মু এ নিয়ে নানান বাড়ির আত্মীয় স্বজনের কাছে অনেক গল্প করে হাসাহাসি করতেন দীর্ঘদিন। আমার মেজাজ খারাপ হত খুব। এখন ভালই লাগে!

[ছবিটি লেখকের হাতে আঁকা, প্রায় এক দশক আগের, আসলে আরও আগের, ২০০৮/০৯ সালের দিকে আঁকা]

মাকলার ডিম: ছোটবেলায় মাকড়সা উচ্চারণ করতে পারতাম না। বলতাম মাকলা! আইয়ুব দাদুর হোমিও দোকান। হোমিও দোকান মানে ছোট ছোট চিনির বড়ি! আহা কি মজার জিনিস। প্রতিদিন দাদুর দোকানে গিয়ে হাত পাততাম। দাদু দুই ভাইকে মুঠোভরে চিনির সাদা সাদা গোলাকার বড়িগুলো দিতেন খেতে। দাদু হয়তো প্রথম প্রথম বলতো মাকড়শার ডিম এগুলো! আমরা উচ্চারণ করতাম ‘মাকলার ডিম’। কালের বিবর্তনে এ জিনিস আমার কাছে আসলেই ‘মাকলার ডিম’ হয়ে গেল! আমি অনেক বড় হয়েও ভাবতাম এই জিনিসের ছদ্দ নাম ‘মাকলার ডিম’। 

দাদুর দোকানে শেষ ছুটিতে গিয়েও ‘মাকলার ডিম’ খেতে ভুলিনি!

মন্তব্য করুন