[প্রথম প্রকাশঃ ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও-এ মার্চ ০৮, ২০১৮ তারিখে]

পাঠক, আপনি জানেন কি ‘পর্দানশিন’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ কি? নিশ্চয়ই জানেন। অন্তপুরবাসিনী বা অবরোধবাসিনী। যাকে ইংরেজিতে বলে “Living behind the curtain.”

সাত মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়াও নগরীর অন্যান্য জায়গাগুলোতে কি হয়েছে অনেকে জানেন। অনিতা বৈরাগী নামে একজন স্কুল ছাত্রি, আফরিনা আসাদ নামে একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রি দুজনেই তাঁদের ব্যক্তিগত ফেইসবুক ওয়ালে লিখেছেন, তাদের উপরে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে গায়ে হাত দিয়েছে। পানি ছিটিয়েছে। আজই এরকম অনেকগুলো ঘটনা দেখলাম। কাল রাতে দেখলাম একজন একটি ভিডিও আপলোড দিয়ে বলেছেন, মোহাম্মদপুর টাউনহলে কয়েকজন যুবক তাকে ঘিরে ধরে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে উত্ত্যক্তকারী আওমি হোক আর কওমি হোক, দলমত নির্বিশেষে একটা অসভ্য প্রজন্ম আছে, যাদের মনের ভেতরে থাকা পাশবিক ইচ্ছাগুলো তারা ধরে রাখতে পারে না। মেয়ে দেখলেই পেটের ভেতরের পশুটা দলা পাকিয়ে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে। হাত আর মুখ চুপ থাকতে পারে না। কেন দলমত নির্বিশেষে বলছি দেখুন। সুনির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক ভাবধারা লালন করা আরেকটা প্রজন্ম আছে যাদের কথায় কর্মে প্রকাশ পায়, বেপর্দা নারীর লাঞ্ছনাটা প্রাপ্য। এ বিষয়ে তাদের বানী হলো “ইভটিজিং বেপর্দা নারীর সামাজিক শাস্তি”।

বাহ! দারুণ না? তারাই ঠিক করে দিচ্ছে কার কি শাস্তি। ‘ধর্ষণ’ শব্দটি লিখে একটু গুগল করুণ তো। যে খবরগুলো আসবে সেগুলোর বেশিরভাগই তিন, চার, ছয় বছর বয়সী শিশু ধর্ষণের খবর। এগুলোর পেছনে কি এই নিষ্পাপ শিশুগুলোর বিদেশি পোশাক, উগ্র বা নির্লজ্জ আচরণ কোনভাবে দায়ি? আপনিই বলুন তো?

জঙ্গিবাদ এবং মাদক এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম সমস্যা। আমার ব্যক্তিগত মতামত, নারী উত্যক্ত করাটাও এ মুহূর্তে একটা জাতীয় সমস্যা। গোপনে চুপিসারে জঙ্গি সংগঠনগুলো যেমন জাফর ইকবাল স্যারদের উপরে হামলা করার জন্য জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, ঠিক তেমনি সারাদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় নস্ট করা, মাদকসেবি, স্বল্প শিক্ষিত কিছু বখাটে নিয়ম করে নারীদের উত্ত্যক্ত করে যাচ্ছে। আরেকটা টাইপ আছে। মৌসুমি ছাত্রনেতা সম্প্রদায়। আজ তারাই ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মাঠ গরম করছে। পরিস্থিতি পাল্টালে এরাই ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে ক্যাসেটে উচ্চস্বরে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটা বাজাবে। বিরিয়ানির প্যাকেটের লোভে এরা যেকোন সমাবেশ হিমাংক থেকে স্ফুটাংকে পৌছে দেবে। এদের কাছে সাত মার্চ, পঁচিশ মার্চ, শেখ মুজিব এসব শব্দের ঐতিহাসিক গুরুত্বের থেকে সাম্প্রতিক মূল্যমানের গুরুত্ব বেশি। বঙ্গবন্ধুর লেখা বইটির এক পাতাও এরা পড়ে দেখেনি। বস্তুত এরা জানেও না তাঁর লেখা বইগুলোর খবর। এরা জাফর ইকবাল স্যারকে চেনে না। এদের কেউ কেউ আবার নায়ক জাফর ইকবালের সাথে স্যারকে গুলিয়ে ফেলে। যেই প্রধানমন্ত্রী স্যারকে দেখে এলেন ওমনি সে ছবিটা ফেইসবুকে দিয়ে এরা “জাফ্রিকবাল্সার” বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলল। এদের মধ্যে আছে আরেকটা চাটুকার উপশ্রেণি। কিছু হইলেই “উমুক ভাইয়ের তুমুক দিবসে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা, হৃদয় থেকে নিরন্তর বালুট্রাকভর্তি ভালোবাসা, অন্তরে আজন্ম পুষে রাখা সলজ্জ মন্ত্রমুগ্ধ মমতা, ফাদার, মাদার…” দেখতে পাওয়া যায়। এদের মনেমগজে তেলের পরিমাণ বেশি বলে ঘিলুর পরিমাণ কম। অজাগায় তেল না ঢাললে আজ আমরা তেল ব্যবসায় সৌদি সরকারকে পেছনে ফেলতাম। সম্মান থেকে কিছু করা আর তেলবাজির পার্থক্য যে প্রজন্ম বোঝে তা এরা টের পায় না। এদের আধিক্য আর আধিপত্যের চাপে ‘সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টার’ আসল অনুসারীরা আজ পর্দার অন্তরালে।

উল্লেখিত সবগুলো প্রজাতিই আমার কাছে এক। পার্থক্য একটাই একদল সাম্প্রদায়িক ব্যবসায়ী। আরেকদল অসাম্প্রদায়িক ব্যবসায়ী।

তাহলে আমাদের বোনদের জন্য সমাধানটা কী? তারা হয় ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বোরকা পড়ে বের হবেন। অথবা পর্দার আড়ালেই থেকে যাবেন। এইতো? এই দুটোর মধ্যে থেকে আমার মনে হয় দ্বিতীয়টিই ভালো। দেশের ইতিহাসে বোরকা পরিহিত মেয়েও কিন্তু মলেস্টেশনের শিকার হয়েছেন। তাই বেগম রোকেয়ার আমলের মতো ঘরে বসেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। একদম উপন্যাসের মতো অবরোধবাসিনী হয়ে যাক সবগুলো মেয়ে। যদি তা না হয় তাহলে উপায় কি? উপায় আমার মনে হয় সবারই জানা আছে। সামাজিক মূল্যবোধ, বিশেষ করে পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষাটা ছড়িয়ে পড়া উচিৎ। আসলে নারী সম্পর্কে আমাদের পুরুষ সমাজের ধারণাটাই ভোগবাদী। এই ভোগবাদী চিন্তাধারাটা এক, ক্ষমতাসীন সম্প্রদায় এবং দুই, মৌলবাদীদের ভেতরে বেশি পরিলক্ষিত হয়। মৌলবাদীরা ধর্মের দোহাই দিয়ে মেয়েদের পণ্য পর্যায়ে নিয়ে যায়। একটু ইউটিউবে যান। গিয়ে ওয়াজগুলো শুনুন। একটু পরেই টের পাবেন, সেগুলোতে নারীদের ‘জিনিস’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকে প্রহার করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। যে দেশে ওয়াজ মাহফিলে প্রকাশ্যে নারীসমাজের ‘বস্তুকরণ’ চলে, বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তমনা লেখক-সাহিত্যিক-অধ্যাপককে মোচওয়ালা বিজ্ঞানী, শু*য়ের বাচ্চা বলে গালি দেওয়া হয়, একই সাথে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সংগঠনের বটের ছায়ায় কিছু নব্য কেঁচো নানাবিধ অপকর্ম করে বেড়ায়, সে দেশে নারীদের উপর দিবালোকে শ্লীলতাহানি তো ঘটবেই তাই না?

আসুন একটু অন্য দিকে নজর দেওয়া যাক। ঢাকা জেলার পাঁচটি ট্রাইব্যুনালের গত ১৫ বছরের নারী ও শিশু নির্যাতন সম্পর্কিত প্রায় আট হাজার খানেক মামলা ঘেঁটে পাওয়া গেছে নিষ্করুণ চিত্র। ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আসা ৭ হাজার ৮৬৪টি মামলার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছে। তখনো পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল ৪ হাজার ২৭৭টি মামলা। অর্থাৎ নিষ্পত্তির পরিমাণ ৫৪ শতাংশ! সাজা হয়েছিল মাত্র ১১০টি মামলায়। যার মানে দাঁড়ায় বিচার হয়েছিল ৩ শতাংশের কম ক্ষেত্রে। বাকি ৯৭ শতাংশ মামলার আসামি হয় বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে, নয়তো পরে খালাস হয়ে গেছে। মামলাগুলোর বেশির ভাগ থানায় করা, কয়েক শ মামলা হয়েছে সরাসরি ট্রাইব্যুনালে। সব কটিরই তদন্তের ভার পুলিশের। তদন্তে অবহেলা, গাফিলতি ও অদক্ষতা থাকে। আদালতে সাক্ষী আনা আর সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে পুলিশ আর পিপিদের অযত্ন ও গাফিলতি থাকে। ভুক্তভোগী পক্ষ হয়রানি আর টাকা খেয়ে মামলা ঘুরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করে। [তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো]

তাতে কি? পদ্মা সেতুতো হচ্ছে। আসুন আমরা সাড়ম্বরে নারী দিবস পালন করি, নারী নির্যাতনের বিষয় বড় বড় বক্তৃতা দিই, অনেক অনেক সভা-সমাবেশ করি এবং সেই সাথে নির্যাতিত নারী যারা বিচার পায়নি তাদেরকে ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ, পানি পড়া ইত্যাদি দিয়ে ব্যথা বেদনা উপশম করার চেষ্টা করি।

একই সাথে আসুন, আমরা আমাদের বোনদের ঘরে আটকে থাকতে উৎসাহ দেই। সমস্বরে বলি, “নারী তুমি থেকে যাও অবরোধবাসিনী”।

মন্তব্য করুন